সুখী থাকার আজব উপায়, চেষ্টা করতে ক্ষতি কি ? ?

আপনার মতে কে পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ?




বিশ্বের সবথেকে ধনী ব্যক্তিটি?
বিশ্বের সবথেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি?
না কি, যার কোন সম্পদের অভাব নেই সেই ব্যক্তিটি?
অথবা যার আছে সবথেকে সুন্দর বা সুদর্শন জীবনসঙ্গী  সেই ব্যক্তিটি?
অথবা যে সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে সেই ব্যক্তিটি?

এরা ছাড়াও অনেকের বিবরণ আমি দিতে পারবো যাদের কেউ হয়তো যথাযথ সুখী নাও হতে পারে, কিন্তু আমাদের আশেপাশের মানুষ বা পরিবেশের প্রক্ষাপট অনুযায়ী যাদেরকে সুখী বা পরিপূর্ণ মনে হয়। আজ আমি এমন একজনের কথা বলতে যাচ্ছি যার বিবরণ শুনে আপনাদের হাঁসি পেতে পারে, মনে করতে পারেন এই ব্যক্তিটি কোন দৃষ্টিকোন থেকে পৃথিবীর সবথেকে সুখী মানুষ হতে পারে? সে একজন নির্বোধ এবং কাপুরুষ মাত্র।
হ্যাঁ সবাই তাকে এমন দৃষ্টি দিয়েই দেখে থাকে। আজ আমি একজন ভীরু, নির্বোধ, গর্ধোব এবং আত্মত্যাগী মানুষের কথা বলবো, সে যেভাবে আমাদের এই পৃথিবীকে দেখে সেই সম্পর্কে বলবো। বিষয়টি যে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বা হতে হবে সেটা মূখ্য নয়। কারণ আমরা সবাই আমাদের নিজের রাজ্যের একমাত্র রাজা।







আমার বন্ধুটির নাম নীরব, তাঁর নামটির মত তাঁর সব আচার আচরণও ঠিক একই প্রকৃতির। কিছুদিন আগে তাকে নিয়ে আমি একটা ফেরিওয়ালার দোকানে যায় কিছু পুরোনো খবরের কাগজ আর কিছু খাতা বিক্রি করতে। এই ফেরিওয়ালাদের একটি বিশেষত্য হচ্ছে এর সবসময় চাইবে কিভাবে ওজনে কম দিয়ে অন্যের থেকে বেশি পরিমাণে জিনিস নেওয়া যায়, প্রায় সব ফেরিওয়ালার নীতিটা যেন এমন হয়ে গেছে, তা যদি ফেরিওয়ালা নিজে কারো বাসায় গিয়ে তার ব্যবসা পদ্ধতি চালায় সেখানেও সে কোন না কোন ভাবেই তার সেই নীতি প্রয়োগ করবেই। তো যাই হোক আমি বিষয়টি প্রত্যক্ষ করার পর বললাম এই যে ভাই তুমি ওজনটা ঠিকমত দাও, তোমার ওজন করার ধরন আমার পছন্দ হচ্ছে না, ফেরিওয়ালা আমাকে বোঝায় উল্টোটা, এক পর্যায়ে তার সাথে আমার অনেক কথা কাটাকাটির পর আমি ওজনে সামান্য পরিমাণে জয় বয়ে আনতে পারলাম। তো সেখান থেকে আসার পথে আমি নীরবকে প্রশ্ন করলাম,
-      আচ্ছা বুঝলাম, তুই মানুষের সাথে বিবাদ করতে চাস না, কিন্তু ঐ লোক আমাদেরকে নিশ্চিতভাবে ঠকাতে বসেছিলো তুই নিজের চোখে দেখলি কিন্তু কিছু বললি না কেন? তুই কি অন্যায়কে অন্যায় বলতে ভয় পাস? এত ভীতু কবে থেকে হলি?
-      আচ্ছা তুই কি মনে করিস ঐ লোকের কাছ থেকে তুই তোর পুরোপুরি অংশটুকু বুঝে নিতে পেরেছিস? সে তোকে একটুকুও পরিমাণেও ঠকাতে অক্ষম হয়েছে?
-      না সেটা বলবো না। তার পরও আমি কিছুটা হলেও কম ঠকেছি, আর হ্যাঁ লোকটাকে একটু শিক্ষা দিতে পেরেছি।
-      আচ্ছা তুই কি মনে করিস ঐ লোক তোর এই শিক্ষা সারাজীবন মনে রাখবে? সে জীবনে আর কাউকে ঠকাবে না?
-      হলপ করে তো আর বলতে পারি না, কিন্তু কিছুদিন হলেও আমার কথা সে মনে রাখবে, যে আমি একটা জিনিস।
-      আচ্ছা আমাদের এই পৃথিবীটা যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি আমাদের থেকে কম জ্ঞানী? তিনি কি চাইলেই ঐ ব্যক্তির হেদায়েত দিতে পারেন না? বা তিনি চাইলেই কি সবকিছু আমাদের সবার মন মত করে দিতে পারেন না? তিনি কেন আন্যয়গুলো দেখেও তার যথাযথ শাস্তি  তৎখনাক কোন বান্দাকে দেন আবার কাউকে দেন না? নিশ্চই কোন কারণ আছে?
-      হ্যাঁ। কিন্তু তুই এই কথা দিয়ে কি বোঝাতে চাস?
-      তুই লোকটার সাথে তর্ক করে তোর হক কিছুট পরিমাণে বাড়াতে পেরেছিস, কিন্তু তোর হক তুই পুরোপুরি পরিমাণে আদায় করতে পারিসনি। এখানে তুই নিজেকে দোষারোপ করবি যে তুই আরেকটু চেষ্টা করলে তোর লাভ আরেকটু বাড়তো, কিন্তু দেখ তুই এখন চাইলেই আল্লাহ্‌র কাছে তোর এই হক ফাকির বিচারটা জোরালোভাবে দিতে পারবি না। কারণ তুই তোর সাধ্যমত চেষ্টা করেছিস এবং তোর হক তুই আদায় করেছিস। অন্যদিকে ঐ দোকানদার কিন্তু অন্য ব্যক্তির সাথে যাই করুক না কেন তোর সাথে ব্যবসায়ের ব্যপারে আল্লহ্‌ যদি তাকে প্রশ্ন করে তখন সে বলতে পারবে, হে আল্লাহ্‌ ঐ লোক তার সর্বচ্চ চেষ্টা করে আমার কাছ থেকে তার প্রাপ্য বুঝে নিয়েছে, আর যদি সে আরো প্রপ্য থাকতো তাহলে সে কেন আমার কাছ থেকে ঐ সময় নিলো না। এক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ কি বিচার করবেন সেটি অবশ্যই আল্লাহ্‌ জানেন, কারণ তিনিই একমাত্র সর্বজ্ঞানী। কিন্তু তুই যদি দেখেও ঐ দোকানদারকে কিছু না বলতিস দোকানী ভাবতো তুই আসলে বোকা, আর বোকা মানুষকে ঠকানো কোন বীরত্বের বিষয় না। পক্ষান্তরে তুই আল্লাহ্‌র কাছে তোর এই হক ফাকির বিষয়টি জোরালোভাবে দাখিল করতে পারতিস। আর দোকানি কোন না কোন একদিন তার এই অপকর্মের জন্য নিজেকে দোষারোপ করতো। আর আল্লাহ্‌র কাছে সে কি উত্তর দিতো?
-      তোর কথা ঠিক আছে। কিন্তু বন্ধু আসল কথা হলো যদি তুমি এই পৃথিবীতে বঁচে থাকতে চাও তাহলে যদি কেউ তোমাকে এক আঙ্গুল দেখায় তবে তাকে তোমার পাঁচ আঙ্গুল দেখাতে হবে। তবেই এই বিশ্বের মাঝে তুমি টিকে থাকতে পারবে।
-      আচ্ছা ধর আমি পাঁচ আঙ্গুল দেখালাম, আমি আমার সক্ষমতার পরিচয় অন্যকে দেখালাম তার পরবর্তীতে কি হতে পারে? সেই অপর লোক যদি ভাবে, হু আমি ওকে এক আঙ্গুল দেখালাম সে কেন আমাকে চারটা আঙ্গুল বেশি দেখালো। দাঁড়াও আমি এখন এই চার আঙ্গুলের বদলে তাঁকে বিশ আঙ্গুলের দেখাবো। আর তুই আবার তার বিশ আঙ্গুলের জবাব দিতে গেলে বিষয়টি কেমন হবে?
-      তো আমাদের উচিত সবকিছু চুপচাপ সহ্য করা?
-      বিষয়টি এমন না। বিষয়টা মূলত ত্যগ হিসাবে নিতে হবে, এবং অপর মানুষকে তোমাকে বোঝাতে হবে যে সে অন্যায় করেছে এবং তার জন্য তাকে আল্লাহ্‌র কাছে জবাব দিতে হবে। যদি সে প্রকৃত জ্ঞানী হয়ে থাকে তবে সে বিষয়টি নিশ্চয় অনুধবন করবে এবং সে আস্তে আস্তে সঠিক রাস্তা অনুসরণ করবে। আমাদের উচিত আন্যকে সঠিক পথে আসার জন্য বারবার সুযোগ দেওয়া, কারণ বারবার যদি কেউ নিজের নজরে ছোট হতে থাকে একদিন সে সত্য পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু মুস্কিল হলো আমাদের এই আশেপাশের পৃথিবী বড় স্বার্থপর সে বারবার কাউকে সুযোগ দেয় না।
-      তোর কথা ঠিক আছে কিন্তু এমনটি আর হবার নয় রে, বড্ড দেরী হয়ে গেছে আমাদের আর কিছু করার নেই। সেজন্য নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা কর। আর এই টপিক্স বাদ দে।
নীরব আমার কথা শুনে নীরবে হাসলো। আর কিছু না বলে আমরা রুমে গেলাম। ধীরে ধীরে তার কিছু নীতি আমাকে অবাক করে তুলেছে, তার একটা হলো সে চাই যে, মানুষ যত বেশি পারে তাকে যেন ঠকায়, কারণ সে চায় লোক তাকে ঠকাক। সে ভবিষ্যতের সম্বল হিসাবে তার এই হকসমূহ আল্লাহ্‌র কাছে চাইবে, সে মনে করে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ তার এই মানবিকতার বা নির্বদ্ধার প্রকৃত মূল্য দিতে সক্ষম।
সম্প্রতি তার একমাত্র বান্ধবীর সাথে তার সম্পর্কের ইতি ঘটে, এই ঘটনার পর তাকে একটু হতাশাগ্রস্ত মনে হয় আমার, আর তাকে আমি বলি,
-      দেখেছিস, তোর ও মন খারাপ হয় তার মানে আসলেই তুই এই পৃথিবীতে শান্তি বা কিছু না কিছু চাস। জীবনে শক্ত হতে শেখ, সে শুধুমাত্র তোকে ব্যবহার করেছে। তার বিপদের সময় সে তোকে কাছে চেয়েছিলো তার বিপদ কাটার পর তোকে দূরে ফেলে দিয়েছে কারণ সে জানে তোর দ্বারা এই পৃথিবীতে কিছু সম্ভব না।
আমার কথা শুনে সে হেঁসে উঠলো আর বললো তুই কি মনে করিস আমি আমার নিজের জন্য মন খারাপ করে আছি? আমি ভাবছি ঐ মেয়ের জন্য, সে চাইলেই আমি তাকে তার পথে তুলে দিয়ে আসতাম। সে এইভাবে চলে গিয়ে তার নিজের নজরে নিজেকে ছোট করেছে, সে যতই ভালো থাকার চেষ্টা করুক না কেন জীবনের একটা সময় সে নিজেকে দোষী ভাববে। সে যদি চাইতো আমি তার এই মানসিক চাপ থেকে তাকে মুক্ত করে তাকে ভবিষ্যতেও সুখী করতে পারতাম। কিন্তু এখন একটু দেরি হয়ে গেছে। ওকে আরাকবার আমি সুযোগ দিব, তার ভুল শুধরে দিয়ে আমি আবার তাকে তার পথে চলে যেতে বলবো। আমি তাকে আবার সাহাজ্য করবো তার জীবনকে আরো সুন্দর করতে। সে যদি চায়। তারপর নীরব আবার তার মনের শান্তি ফিরিয়ে আনে।



আমি তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা তুই এত শান্ত কিভাবে থাকিস? তোর শান্তি দেখে আমার খুব হিংসা হয়। তুই কি এই পৃথিবী থেকে কিছুই চাস না? তুই কি চাস না তোর নিজের কোন ফ্যামেলি হোক? কোন বাবা কি তার মেয়েকে তোর মত গর্ধবের হাতে তার মেয়েকে তুলে দেবে? আর যদি কেউ দেয়ও তুই তাকে খাওয়াবি কি? তোর সততা না তাকেও তোর মত ত্যগি বানাবি?
সে আমাকে বললো, আসলে আমরা সবাই এই কথাটা ভাবি যে জীবনে ঠিকঠাক ভাবে চলতে গেলে একজন ভালো, সুন্দর, জ্ঞানী জীবনসঙ্গিনী প্রয়োজন আর তাকে অর্জন করতে হলে তোমার যথার্থ পরিমাণে নাম যশ ও সম্পদ থাকতে হবে তাছাড়া তুমি এটার যোগ্য নও। কি একটা আজব নিয়ম তাই না? এই নিয়ম কে সৃষ্টি করেছে নিশ্চিয় জানিস? আমাদের মত মানুষের সৃষ্টি এই নিয়ম। আর আমাদের অবচেতন মন এই নিয়মটা বিশ্বাস করে আসছে। আর তার প্রতিফলন ঘটছে যুগ যুগ ধরে। তুই কি মনে করিস যদি তোর পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা বা সম্পদ না থাকে তবে তুই তোর পরিবারের ভারণ পোষণ করতে পারবি না?
আসলে মূল কথাটা হলো আমরা আমাদের অবচেতন মনকে যে কথা বলিই না কেন, তা সেটি সত্য বা মিথ্যা যায় হোক অবচেতন মন সেটা বিশ্বাস করে এবং তার প্রতিফলন সে বাস্তবে প্রদর্শন করে। আর তার বাস্তবটা ঠিক তার কল্পনার মতই হয়ে থাকে। তুই যদি তোর মনকে যেভাবেই হোক বুঝাতে সক্ষম হস যে তুই দিনে মাত্র একবেলা আহার করে বেঁচে থাকতে পারিস তুই সেটা পারবি। আবার যদি তু তোর মনকে বোঝাস যে যদি তুই দিনে পাচবার না খেলে তোর শরীরে পর্যাপ্ত শক্তির সঞ্চয় করতে পারবি না, তবে সে সেইরকম প্রতিফলন ই করবে।
বিষয়টি আরেকটু ভাঙ্গা যাক তুই যদি মনে করিস আগামী এক মাস যে তোকে যত বড় কথায় বলুক না কেন তার কথার কোন বড় জবাব তুই দিবি না আর তকে তার ভুল শুধরানোর সুযোগ দিবি সেটাতে তোর শারীরিক মা মানসিক কোন ক্ষতি হলেও তোর মনকে বলবি যে তুই ভালো আছিস, দেখ সে কি উত্তর দেয়। বিষয়টি আসলে অত সহজ নয়। তাপরও অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখতে পারিস, কোন পরিবর্তন আসে কি না। আমি সত্যিই খুব সুখ অনুভব করি যখন কোন মানুষ আমাকে নির্বোধ বলে বা আমাকে ঠকায়। কারণ আমি এই পৃথিবীর সুখকে আমার এই ত্যাগের ভিতরে আবদ্ধ করেছি। আর আমি আমার অবচেতন মনকে এই নীতি বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। আর সেজন্য আমি নিজেকে একটুও দোষারোপ করিনা। আর এই পৃথিবীর মানুষেরা আমকে কি বললো না বললো তাতে আমার কিছু যায় আসে না, কারণ আমরা সবাই আমাদের নিজের রাজ্যর রাজা। আর আলাদা আলাদা রাজের নীতি আলাদা আলাদা হতে পারে।




নীরবের আরো অনেক নীতি আছে, সেগুলো না হয় আরেকদিন বলবো আজ শুধু এইটুকু বলবো নীরবের নীতিটা আপনাদের ভালো লেগেছে কি না জানি না। তাকে যে অনুসরণ করতে হবে সেটাও বলবো না শুধু এইটুকু বলবো, আমাদের অবচেতন মনটা সত্যিই বোকা তাকে আপনি যেটা বোঝাবেন সে সেটিই বুঝবে আর বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটাবে। আপনি যদি তাকে শেখান যে যাই হোক না কেন তোকে সর্বদা সুখী থাকতে হবে এবং এই কথা আপনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, এই বোকা বস্তুটি সেটা বিশ্বাস করতে বাধ্য। আর সেটির ভীতরে প্রকৃত সুখ বিরাজ করবে আশা করি।

আর হ্যাঁ নীরব বিশ্বাস করে যে “ভোগে সুখ নয়, ত্যগেই প্রকৃত সুখ” আর এটিও বিশ্বাস করে যে এই পৃথিবী পরবর্তী অসীম জীবনের পরীক্ষাগার মাত্র। এবং এই পরীক্ষা একটি নিদৃষ্ট সময় পর শেষ হয়ে যাবে।


 



মন্তব্যসমূহ